গত চার অর্থবছরে বাংলাদেশের মূলধনি যন্ত্রপাতি, চিকিৎসাসামগ্রী, যানবাহন ও ভারী সরঞ্জাম আমদানি কমেছে প্রায় ৪৫.১ শতাংশ। এই সময়ে লক্ষণীয় ধীরগতি দেখা গেছে দেশের শিল্প প্রবৃদ্ধিতেও। এসব কারণে নতুন বিনিয়োগ ও কারখানা সম্প্রসারণের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।২০২১-২২ অর্থবছরে এসব পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ২২ লাখ ৬০ হাজার টন। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে দাঁড়ায় ১২ লাখ ৪০ হাজার টনে। তবে টানা তিন বছর কমার পর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এসব পণ্য আমদানি ১৩.৭ শতাংশ বেড়ে ১৪ লাখ ১০ হাজার টনে পৌঁছায়।চট্টগ্রাম কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, আরও বড় পরিসরে, ১৫ বছরে এসব পণ্যের সম্মিলিত আমদানি কমেছে ৪১.৫ শতাংশ। ২০০৯-১০ অর্থবছরে এসব পণ্য আমদানির পরিমাণ ছিল ২৪ লাখ ১০ হাজার টন, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১৪ লাখ ১০ হাজার টনে নেমে এসেছে।অবশ্য আমদানির পরিমাণের দিক থেকে নিম্নমুখী প্রবণতা থাকলেও, মূল্যমানের দিক থেকে চিত্রটি সম্পূর্ণ বিপরীত। মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার অবমূল্যায়নের কারণে একই সময়ে আমদানি ব্যয় দ্বিগুণেরও বেশি (১৫২.৭ শতাংশ) বেড়েছে। এই ব্যয় ১৩ হাজার ৬৫৩ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধিতে ব্যাপক গতিমন্থরতার পাশাপাশি আমদানির এই নিম্নমুখী প্রবণতা দেখা দিয়েছে।বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য অনুসারে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৮.১৮ শতাংশ। কিন্তু ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা কমে ৩.৭১ শতাংশে নেমে আসে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে এই হার আরও কমে ২.৮৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের এই পরিসংখ্যানটি সাময়িক।ঋণগ্রহণের চড়া ব্যয়, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, ঋণপত্র (এলসি) খুলতে জটিলতা ও আমদানিতে নানা বিধিনিষেধের কারণে এই ধীরগতি দেখা দিয়েছে। এর পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহের দীর্ঘস্থায়ী সংকটও বড় ভূমিকা রেখেছে।যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানির এই দীর্ঘস্থায়ী নিম্নমুখী প্রবণতা মূলত বিনিয়োগ চাহিদার দুর্বলতাকেই নির্দেশ করে। এটি দেশের সামগ্রিক উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। তবে দেশীয় বিনিয়োগ যে সার্বিকভাবে কমে গেছে, তা প্রমাণ করার জন্য কেবল আমদানির এই তথ্যই যথেষ্ট নয়।গতি হারাচ্ছে বিনিয়োগঅর্থায়ন ও গ্যাস-বিদ্যুতের মতো ইউটিলিটির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহের অনিশ্চয়তার কারণে ব্যবসায়ীরা এখন বড় পরিসরে বিনিয়োগ করতে আগের চেয়ে অনেক বেশি অনাগ্রহী হচ্ছেন বলে জানান বাংলাদেশ গার্মেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টারস অ্যাসোসিয়েশনের (বিজিএমইএ) সাবেক সহসভাপতি নাসির উদ্দিন চৌধুরী।পোশাক খাত প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে নিট কাপড়ের উৎপাদন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়লেও, ওভেন কাপড়ের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ এখনও ব্যাপকভাবে আমদানিনির্ভর; বিশেষ করে চীনের ওপর।নাসের উদ্দিন আরও বলেন, নিট কাপড়ের প্রায় ৯০ শতাংশই এখন স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু ওভেন কাপড়ের জন্য এখনও আমদানির ওপরই বেশি ভরসা করতে হয়। 'নিট ও ওভেন দুই ধরনের কাপড়ই শতভাগ দেশীয়ভাবে উৎপাদন করতে পারলে আমরা দেশের বৈদেশিক মুদ্রার বড় একটি অংশ ধরে রাখতে পারতাম।'তবে বৃহৎ পরিসরের টেক্সটাইল কারখানা স্থাপনের জন্য বিপুল মূলধন, গ্যাস ও বিদ্যুতের নির্ভরযোগ্য সরবরাহ এবং সাশ্রয়ী অর্থায়নের প্রয়োজন। এসবের নিশ্চয়তা না থাকলে বিনিয়োগকারীরা এ ধরনের ঝুঁকি নিতে নারাজ বলে জানান তিনি।নাসির বলেন, 'সরকার যদি গ্যাস ও বিদ্যুতের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করতে পারে এবং স্বল্প সুদে অর্থায়নের ব্যবস্থা করে, তাহলে বাংলাদেশের বিনিয়োগকারীরা বিনিয়োগ করতে প্রস্তুত।'যেসব খাতে বাংলাদেশ এখনও ব্যাপক আমদানিনির্ভর, ওই খাতগুলোতে দেশীয় উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াতে সরকারকে পাঁচ বছর মেয়াদি পরিকল্পনা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।চার বছরের ধারাবাহিক পতনকাস্টমসের তথ্যে থাকা এই সম্মিলিত আমদানির পতন ২০২১-২২ অর্থবছর থেকে বিশেষভাবে লক্ষণীয়।ওই অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩০ হাজার ৪০৬.২০ কোটি টাকা মূল্যের ২২ লাখ ৬০ হাজার টন মূলধনি যন্ত্রপাতি ও সংশ্লিষ্ট পণ্য আমদানি করেছিল। এরপর আমদানির পরিমাণ কমে ২০২২-২৩ অর্থবছরে ১৫ লাখ ১০ হাজার টন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১৪ লাখ ৫০ হাজার টন ও ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১২ লাখ ৪০ হাজার টনে দাঁড়ায়।তবে এই তিন বছরে আমদানির পরিমাণ কমলেও ব্যয় তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল—যা যথাক্রমে ২৮ হাজার ১৩০.১৪ কোটি, ২৮ হাজার ২৩৩.৩৮ কোটি ও ২৯ হাজার ৪১৭.২২ কোটি টাকা।এরপর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আমদানির পরিমাণ কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়ে ১৪ লাখ ১০ হাজার টনে পৌঁছায়, অন্যদিকে আমদানি ব্যয় এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪ হাজার ৪৯৭ কোটি টাকা।এই পরিসংখ্যানগুলোই বলছে, আমদানির এই পতন কেবল এক বছরের কোনো আকস্মিক ধাক্কা ছিল না।২০২৫-২৬ অর্থবছরে আংশিক ঘুরে দাঁড়ানোর আগে কয়েক বছর ধরেই ব্যবসায়ীরা নতুন উৎপাদন লাইন স্থাপন, কারখানা নির্মাণ বা বিদ্যমান সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জাম আমদানি কমিয়ে দিয়েছিলেন। আমদানির পরিমাণ কমার বিপরীতে দীর্ঘমেয়াদে এর মূল্যমান বা ব্যয় বৃদ্ধির এই প্রবণতা, দেশে প্রবেশ করা সরঞ্জামের ভৌত পরিমাণ এবং সেসব আমদানির মোট মূল্যের মধ্যকার বড় ধরনের ব্যবধানকে তুলে ধরে।তবে কাস্টমসের এই উপাত্ত থেকে এককভাবে বোঝার উপায় নেই, এই ব্যবধান দাম বাড়ার কারণে, আমদানিকৃত সরঞ্জামের ধরনে পরিবর্তনের কারণে, নাকি অন্য কোনো প্রভাবকের কারণে তৈরি হয়েছে কি না।আমদানিনির্ভরতা অব্যাহতইন্টারন্যাশনাল বিজনেস ফোরাম অভ বাংলাদেশের (আইবিএফবি) চট্টগ্রাম চ্যাপ্টারের সভাপতি এস এম আবু তৈয়ব বলেন, জনসংখ্যা ও ভোগ বৃদ্ধির কারণে স্বাভাবিকভাবেই আমদানির চাহিদা বাড়ছে। তবে যেসব ক্ষেত্রে বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক, সেখানে বাংলাদেশের উচিত আমদানির বিকল্প হিসেবে দেশীয় উৎপাদনকে বেছে নেওয়া।তিনি বলেন, 'আমরা যেসব পণ্য আমদানি করি, সেগুলো যদি ধীরে ধীরে দেশেই উৎপাদন করা যায়, তাহলে তা অর্থনীতির জন্য অনেক ভালো হবে।' স্থানীয় উৎপাদন বাড়াতে প্রধান আমদানি পণ্যগুলো পর্যালোচনা ও সরকারি কৌশল প্রণয়নেরও আহ্বান জানান তিনি।তৈয়ব বলেন, অতিরিক্ত আমদানিনির্ভরতার কারণে বাংলাদেশ যুদ্ধ, সরবরাহ চেইন বাধাগ্রস্ত হওয়া ও বৈশ্বিক বাণিজ্য নীতির পরিবর্তনের মতো বাহ্যিক ধাক্কাগুলোর কাছে অরক্ষিত হয়ে পড়ে। তৈরি পোশাক খাত এই নির্ভরতার একটি বড় উদাহরণ বলে উল্লেখ করেন তিনি।দেশের সবচেয়ে বড় রপ্তানিমুখী শিল্প খাত হওয়া সত্ত্বেও, পোশাক খাত এখনও আমদানিকৃত কাঁচামাল, বিশেষ করে ওভেন কাপড়ের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল।বিনিয়োগের উচ্চ ব্যয়চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ফাইন্যান্স বিভাগের অধ্যাপক মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামের আমদানি কমে যাওয়া মূলত বিনিয়োগের দুর্বল চাহিদারই প্রতিফলন। এর ফলে দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর পথও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।তিনি বলেন, 'মূলধনি যন্ত্রপাতির আমদানি কমে যাওয়া দেশীয় উৎপাদনের নিম্নমুখী প্রবণতাকেই তুলে ধরে।'এই অধ্যাপক আরও বলেন, চড়া সুদহার, টাকার অবমূল্যায়ন, ডলার সংকট ও এলসি খোলার জটিলতার কারণে বিনিয়োগ নিরুৎসাহিত হচ্ছে। অন্যদিকে আমদানির বাড়তি খরচ উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা দেশীয় উৎপাদকদের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার সক্ষমতাকে দুর্বল করে দিচ্ছে।তিনি বলেন, 'ব্যবসায়ীরা পর্যাপ্ত গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পাচ্ছেন না। তারা যদি ইউটিলিটি সেবা ঠিকমতো না পান, তাহলে উৎপাদন করবেন কীভাবে?'মহিউদ্দিন চৌধুরী বলেন, শুল্ক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নীতি পরিবর্তনের মতো বৈশ্বিক বাণিজ্যের অনিশ্চয়তাগুলোও বাংলাদেশের রপ্তানি খাতের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।একদিকে দেশীয় উৎপাদনের দুর্বল অবস্থা, অন্যদিকে আমদানির উচ্চ ব্যয়—এই দুইয়ে মিলে অর্থনীতির ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ এর ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মেটাতে ব্যবসায়ীদের আমদানির ওপর আরও বেশি নির্ভর করতে হবে।ভোগ বাড়ছে, পিছিয়ে পড়ছে বিনিয়োগচট্টগ্রাম চেম্বার অভ কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি আমিরুল হক বলেন, আমদানির এই ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা বাংলাদেশের ভোক্তা অর্থনীতির সম্প্রসারণেরও একটি প্রতিফলন। কারণ মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও ভোগ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে খাদ্য, ভোগ্যপণ্য ও অন্যান্য সামগ্রীর চাহিদাও বাড়ছে।কিন্তু ক্রমবর্ধমান ভোগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে উৎপাদন সক্ষমতাও বাড়ানো প্রয়োজন। যন্ত্রপাতি আমদানির বিষয়টি শিল্প খাতের বিনিয়োগের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই দেশে যন্ত্রপাতির উৎপাদন বাড়িয়ে এ ঘাটতি পূরণ করা না গেলে আমদানির এই ধারাবাহিক পতন উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণের পথকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে।তাই বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি কেবল আমদানি কমানো নয়। বরং যেসব খাতে স্থানীয় উৎপাদন বাণিজ্যিকভাবে লাভজনক, সেগুলোতে দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটানোর পাশাপাশি উৎপাদন সক্ষমতায় বিনিয়োগ অব্যাহত রাখাই আসল চ্যালেঞ্জ।
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬