দেশের আমদানি ব্যবস্থাকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও ব্যবসাবান্ধব করতে নতুন ‘আমদানি নীতি আদেশ ২০২৬–২০২৯’ জারি করেছে সরকার। নতুন নীতিতে আমদানি প্রক্রিয়া সহজীকরণ, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য, ব্যবসায়ীদের জন্য নীতিগত স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
মঙ্গলবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এ-সংক্রান্ত গেজেট প্রকাশ করে। ‘ইমপোর্টস অ্যান্ড এক্সপোর্টস (কন্ট্রোল) অ্যাক্ট, ১৯৫০’-এর ৩(১) ধারার ক্ষমতাবলে জারি করা এ আদেশ ২০২৬ সাল থেকে ২০২৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত কার্যকর থাকবে।
নতুন নীতিতে পণ্যের শ্রেণিবিন্যাস, আমদানির শর্ত, প্রয়োজনীয় সনদপত্র, পণ্যের উৎপত্তি দেশ নির্ধারণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিধিমালা অনুসরণের বিষয়গুলো আরও সুসংগঠিত করা হয়েছে। এতে আমদানিকারকদের জন্য নিয়ম-কানুন সম্পর্কে স্পষ্টতা বাড়বে এবং ব্যবসায়ীরা আগাম পরিকল্পনা করার সুযোগ পাবেন।
মূল্যসীমা ছাড়াই চুক্তির মাধ্যমে আমদানি
নতুন আমদানি নীতির অন্যতম বড় পরিবর্তন হলো পণ্য আমদানির অর্থ পরিশোধের পদ্ধতি। এখন ঋণপত্র বা এলসি খোলার পাশাপাশি কোনো মূল্যসীমা ছাড়াই ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে পণ্য আমদানি করতে পারবেন শিল্প ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের আমদানিকারকেরা।
আগের ২০২১–২০২৪ সালের নীতিতেও এলসি ছাড়া ক্রয়-বিক্রয় চুক্তির মাধ্যমে আমদানির সুযোগ ছিল। তবে বিভিন্ন পণ্য ও খাতের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট সীমা ও শর্ত প্রযোজ্য ছিল। নতুন নীতিতে সেই সুযোগ আরও বিস্তৃত করা হয়েছে।
৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল
মোটরসাইকেল আমদানির ক্ষেত্রেও পরিবর্তন আনা হয়েছে। এখন সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় সর্বোচ্চ ৩৭৫ সিসি পর্যন্ত মোটরসাইকেল আমদানি করা যাবে।
এর আগে ২০২১–২০২৪ সালের আমদানি নীতি অনুযায়ী, সম্পূর্ণ তৈরি অবস্থায় ১৬৫ সিসির বেশি মোটরসাইকেল আমদানিতে বিধিনিষেধ ছিল। ফলে নতুন নীতিতে মোটরসাইকেল আমদানির পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ল।
ফ্রি ট্রেড জোন ও বন্ডেড ওয়্যারহাউজ
নতুন নীতিতে ফ্রি ট্রেড জোন এবং সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউজ প্রতিষ্ঠার বিধান রাখা হয়েছে। এর মাধ্যমে রপ্তানিমুখী শিল্পের কাঁচামাল সংরক্ষণ ও সরবরাহ ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার পাশাপাশি বাংলাদেশকে আঞ্চলিক বাণিজ্য ও লজিস্টিকসের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ তৈরি হবে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির সুবিধা
এফটিএ, সেপা, ইপিএসহ বিভিন্ন আঞ্চলিক ও দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য চুক্তির আওতায় সুবিধা গ্রহণের বিষয়েও নতুন নীতিতে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব চুক্তির মাধ্যমে শুল্ক সুবিধা, বাজার সম্প্রসারণ এবং আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থায় বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে।
পাশাপাশি পণ্যের ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ বা উৎপত্তি দেশসংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে পণ্যের উৎস সম্পর্কে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য চুক্তির আওতায় প্রযোজ্য সুবিধা গ্রহণ সহজ হবে।
আন্তর্জাতিক মান অনুসরণের ওপর জোর
নতুন আমদানি নীতিতে আন্তর্জাতিক মান ও কারিগরি বিধিমালা অনুসরণের বিষয়টিও গুরুত্ব পেয়েছে। বিশেষ করে টেকনিক্যাল ব্যারিয়ার্স টু ট্রেড (টিবিটি), কোডেক্স অ্যালিমেন্টেরিয়াস এবং বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) মানদণ্ড অনুসরণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এর ফলে মানসম্পন্ন পণ্য আমদানি নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাণিজ্য ব্যবস্থাপনাও শক্তিশালী হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রবাসী বিনিয়োগ ও রপ্তানিমুখী শিল্পে সুবিধা
প্রবাসী বাংলাদেশিদের শিল্পে বিনিয়োগে উৎসাহিত করতে আমদানি সুবিধাও সম্প্রসারণ করা হয়েছে। অনুমোদিত শিল্পপ্রতিষ্ঠানের জন্য মূলধনি যন্ত্রপাতি, যন্ত্রাংশ ও কাঁচামাল আমদানির প্রক্রিয়া সহজ করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে রপ্তানি বহুমুখীকরণ ও উচ্চ মূল্য সংযোজনসম্পন্ন পণ্যের রপ্তানি বাড়াতে রপ্তানিমুখী শিল্পে কাঁচামাল ও উৎপাদন উপকরণ আমদানির সুযোগ বাড়ানো হয়েছে। বিশেষ করে এলডিসি উত্তরণের পর আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে এ সুবিধা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, দীর্ঘমেয়াদি ও স্থিতিশীল আমদানি নীতি শিল্পের প্রয়োজনীয় কাঁচামাল, মূলধনি যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি আমদানি সহজ করতে পারে। এতে উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি শিল্পায়ন, বিনিয়োগ ও রপ্তানি সম্প্রসারণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে নতুন আমদানি নীতিতে শুধু আমদানি নিয়ন্ত্রণ নয়, বরং শিল্পায়ন, বিনিয়োগ, রপ্তানি ও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সঙ্গে সমন্বিত একটি ব্যবসাবান্ধব কাঠামো তৈরির ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

মঙ্গলবার, ২৫ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬
