গ্রামের পুরনো রাস্তা ও কালভার্ট সংস্কারের জন্য নেওয়া হয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার একটি প্রকল্প। অথচ এই প্রকল্পেই কোটি টাকা ব্যয়ে ৮০টি কম্পিউটার কেনার প্রস্তাব রয়েছে। সঙ্গে ৩০ লাখ টাকার সফটওয়্যার এবং প্রকল্পের পরামর্শকদের পেছনে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ কোটি টাকা। শুধু তাই নয়, প্রতি কিলোমিটার রাস্তা সংস্কারে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রে নতুন সড়ক নির্মাণই সম্ভব। স্থানীয় ও জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও যোগাযোগব্যবস্থা ও প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর দিক থেকে এখনো পিছিয়ে রয়েছে দেশের গ্রামীণ অঞ্চল। বিশেষ করে দুর্বল রাস্তাঘাটের কারণে সাধারণ মানুষকে নিয়মিত ভোগান্তিতে পড়তে হয়, যা বর্ষা মৌসুমে আরও তীব্র হয়। এই পরিস্থিতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে ৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রামীণ সড়ক ও কালভার্ট সংস্কারের প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে সর্বশেষ একনেক সভায়। প্রকল্পের আওতায় ৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক এবং ৭ হাজার মিটার ব্রিজ-কালভার্ট পুনর্বাসনের কথা রয়েছে। এর মধ্যে ৩ হাজার ৮৯৩ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রায় ৫ হাজার কিলোমিটার পুরনো সড়ক সংস্কার করা হবে। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় পড়ছে প্রায় ৮০ লাখ টাকা। বিশ্লেষকদের মতে, এই অর্থ দিয়ে প্রায় এক কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণ করাও সম্ভব। আরও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে কালভার্ট সংস্কারের ব্যয় নিয়ে। প্রতি ১০ মিটার কালভার্ট মেরামতে ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় সোয়া কোটি টাকা। বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রামীণ সড়কের পুনর্নির্মাণে এত বেশি ব্যয় অস্বাভাবিক। কারণ নতুন সড়ক নির্মাণেও স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের মোটামুটি একই ধরনের ব্যয় হয়ে থাকে। ফলে পুরনো সড়ক সংস্কারে একই ধরনের ব্যয় ধরা হলে সেখানে অনিয়ম বা দুর্নীতির সুযোগ তৈরি হতে পারে। প্রকল্পের ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে সরঞ্জাম কেনাকাটাতেও। গ্রামের রাস্তা মেরামতের জন্য ৮০টি কম্পিউটার কেনার প্রস্তাব রয়েছে কোটি টাকা ব্যয়ে। রয়েছে ৩০ লাখ টাকার সফটওয়্যার। এ ছাড়া ঠিকাদারদের মাধ্যমে কাজ করানো হলেও প্রকল্পের আওতায় ৬৪টি রোড রোলার কেনার জন্য প্রায় ৭৭ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর পাশাপাশি চার কোটি টাকার মনিহারি সামগ্রী, ১৪০টি মোটরসাইকেল, দুটি জিপ এবং মোটরযান পরিচালনার জন্যও অর্থ চাওয়া হয়েছে। প্রকল্পের কাজ তদারকির জন্য পরামর্শকদের পেছনে ব্যয় ধরা হয়েছে আরও ১৪ কোটি টাকা। সাবেক এক পরিকল্পনা সচিব প্রকল্পটির সামগ্রিক ব্যয় বিশ্লেষণ করে এতে বড় ধরনের অসঙ্গতি দেখছেন। তার মতে, প্রকল্প হলেই গাড়ি, মোটরসাইকেলসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম কেনার যে প্রবণতা রয়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি। সরকার একদিকে অর্থ সংকট ও কৃচ্ছ্রসাধনের কথা বলছে, অন্যদিকে এ ধরনের প্রকল্পে বিপুল পরিমাণ অর্থ যানবাহন ও অন্যান্য সরঞ্জাম কেনায় ব্যয় করার প্রস্তাব সেই নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক। প্রকল্পটি চলতি অর্থবছরে শুরু হয়ে ২০৩০ সালে শেষ হওয়ার কথা। তবে রাস্তা ও কালভার্ট সংস্কারের মূল কাজের পাশাপাশি এত বিপুল অর্থে কম্পিউটার, যানবাহন, রোড রোলার ও পরামর্শক ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে এখনই প্রশ্ন তুলছেন বিশ্লেষকরা।

বৃহস্পতিবার, ২৭ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৬ আগস্ট ২০২৬
