বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতা আরও গভীর করতে এবং এই অঞ্চলে চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিটি (ইপিএ) চলতি পার্লামেন্ট অধিবেশনেই পাস করাতে চায় জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বাংলাদেশের এটিই প্রথম কোনো দেশের সঙ্গে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি। চুক্তিটি তৈরির সময় শুল্ক-সংক্রান্ত কারিগরি ও প্রয়োজনীয় বিষয়ে বাংলাদেশকে নানাভাবে সহায়তা দিয়েছে জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
জাপানি সংবাদমাধ্যম নিক্কেই এশিয়ার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, টানা অর্থনৈতিক উন্নতির ওপর ভর করে বাংলাদেশের আগামী মাসের শেষ দিকে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে যাওয়ার কথা রয়েছে। এলডিসি সুবিধা উঠে গেলে উন্নত দেশগুলোতে পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে আগের মতো আর শুল্কমুক্ত সুবিধা পাওয়া যাবে না। তবে জাপানের সঙ্গে এই অর্থনৈতিক চুক্তি কার্যকর হলে, এলডিসি উত্তরণের পর যেসব নতুন শুল্ক আরোপ হবে, সেগুলোর নেতিবাচক প্রভাব অনেকটাই সামলে নেওয়া সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
গত ফেব্রুয়ারি মাসে দুই দেশের মধ্যে এই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়। চুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর হতে দুই দেশের পার্লামেন্টে এটি অনুমোদন পাওয়া সহ ভেতরের সব আইনি প্রক্রিয়া শেষ করে পরস্পরকে জানাতে হবে। আশা করা হচ্ছে, ২০২৭ সালের প্রথমার্ধের মধ্যেই চুক্তিটি পুরোপুরি কার্যকর হতে পারে।
চুক্তিটি কার্যকর হলে বাংলাদেশ জাপান থেকে যেসব গাড়ির ইঞ্জিন ও টায়ার আমদানি করে, সেগুলোর ওপর থাকা শুল্ক আগামী ১৫ বছরের মধ্যে সম্পূর্ণ তুলে নেওয়া হবে। পাশাপাশি জাপানের তৈরি যাত্রীবাহী গাড়িগুলো ভবিষ্যতে অন্যান্য দেশের মতোই সমান সুবিধা পাবে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে জাপানে রপ্তানি হওয়া পোশাক ও টেক্সটাইল পণ্যের ওপর থেকেও সব শুল্ক তুলে নেওয়া হবে। এর ফলে এলডিসি উত্তরণের পরও জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পোশাকের দাম বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে না। ভবিষ্যতে বাংলাদেশ যেন অন্য কোনো দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে গিয়ে কোনো ধরনের ক্ষতিকর বা অসুবিধাজনক শর্তে জড়িয়ে না পড়ে, সেই ঝুঁকি কমানোর কথা মাথায় রেখেই জাপান সরকার বাংলাদেশকে এই চুক্তির খসড়া তৈরিতে সাহায্য করেছে।
কোন কোন খাতে শুল্ক কমবে কিংবা কোন কোন দেশীয় পণ্যকে সুরক্ষার আওতায় রাখা দরকার—কেবল সেসব আলোচনার মধ্যেই জাপান সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রতিটি ধারার অর্থনৈতিক প্রভাব ও সম্ভাব্য ঝুঁকি কী হতে পারে, তা-ও বিস্তারিত তুলে ধরেছে জাপান। পাশাপাশি এই চুক্তি বাস্তবায়নে দেশের ভেতরে কেমন আইনি কাঠামো লাগবে, তারও একটি রূপরেখা তারা দিয়ে দিয়েছে।
বাংলাদেশের প্রথম এই অর্থনৈতিক চুক্তিটি ভবিষ্যতে অন্য দেশের সঙ্গে বাণিজ্য আলোচনার ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। চীন যখন বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক আরও গভীর করার চেষ্টা করছে, তখন জাপানের সঙ্গে করা এই চুক্তিটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়মের একটি ভালো উদাহরণ হয়ে থাকবে। বর্তমানে বাংলাদেশে আমদানির সবচেয়ে বড় উৎস হলো চীন, তাই চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেশ শক্ত। ২০২৪ সালে ভারত-বান্ধব হাসিনা সরকারের পতনের পর থেকে বাংলাদেশ নিরাপত্তা ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে চীনের কাছ থেকে সহযোগিতা চেয়ে আসছে।
জাপানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানান, ‘চীন সবসময় নিজের স্বার্থের কথা চিন্তা করেই বিভিন্ন অর্থনৈতিক চুক্তি তৈরি করবে।’
জাপানের আগে থেকে সিপিটিপিপি বা কম্প্রিহেনসিভ অ্যান্ড প্রগ্রেসিভ এগ্রিমেন্ট ফর ট্রান্স–প্যাসিফিক পার্টনারশিপের মতো বড় বড় অর্থনৈতিক চুক্তি বাস্তবায়নের অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের এই দীর্ঘ অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে জাপান একদিকে বাংলাদেশকে স্বাবলম্বী করতে ও তাদের সঙ্গে অর্থনৈতিক সম্পর্ক জোড়ালো করতে চায়, অন্যদিকে এই অঞ্চলে চীনের একক প্রভাব কমিয়ে ভারসাম্য বজায় রাখতে চায়।

রোববার, ১৮ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ অক্টোবর ২০২৬
