এক্সপোর্ট–ইমপোর্ট

কোন কোন কোম্পানির শেয়ার কিনলে ঠকবেন না

ডেক্স রিপোর্ট
ডেক্স রিপোর্ট
প্রকাশ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬
কোন কোন কোম্পানির শেয়ার কিনলে ঠকবেন না

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে মুনাফা করতে চান, কিন্তু কষ্টের জমানো টাকা হারানোর ভয় রয়েছে? কোন শেয়ার কিনলে লোকসানের ঝুঁকি কম হবে, কোন কোম্পানির শেয়ারের দাম তুলনামূলক কম এবং কোনটি নিয়মিত মুনাফা ও লভ্যাংশ দিচ্ছে—এসব প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে বিনিয়োগকারীদের মনে। বিশেষ করে ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) কম হলে অনেকেই সেটিকে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখেন। কিন্তু কম দামের শেয়ার কিনলেই কি লাভ হবে?

বাস্তবতা হলো, শেয়ারবাজারে এমন কোনও শেয়ার নেই, যেটি কিনলে লোকসান হবে না—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায়। বরং কম দামের আড়ালে কোনও কোম্পানির দুর্বল আর্থিক অবস্থা, আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা কিংবা ঋণ আদায়ে সংকট লুকিয়ে থাকতে পারে। আবার ভালো কোম্পানির শেয়ারও অতিরিক্ত দামে কিনলে লোকসান হতে পারে।

তবে কোম্পানির আয়, মুনাফা, ঋণ, লভ্যাংশ ও আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের কয়েকটি শেয়ার প্রাথমিকভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে। তবে শুধু পিই রেশিও দেখে শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না।

কম পিই রেশিওর ব্যাংক কোনগুলো?

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, দেওয়া হিসাবের তালিকায় যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের পিই রেশিও তুলনামূলক কম। এসব ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় ও বাজারদরের অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিক বিশ্লেষণ শুরু করতে পারেন।

ডিএসইর উল্লেখিত তথ্যে ব্যাংকগুলোর পিই রেশিও —

যমুনা ব্যাংকের ২.৮৮, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৩.২৩, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৩.৪৫, এনসিসি ব্যাংকের ৩.৫১ এবং প্রাইম ব্যাংকের ৪.১৪। পিই রেশিও কম হওয়ায় এসব ব্যাংকের শেয়ারকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের তালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে এই তালিকা কোনও শেয়ার কেনার সুপারিশ নয়। সর্বশেষ বাজারদর, শেয়ারপ্রতি আয়ের হিসাবের সময়কাল এবং আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী পিই রেশিও পরিবর্তিত হতে পারে। বিনিয়োগের আগে হালনাগাদ তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি।

কম পিই রেশিও মানেই কি ভালো শেয়ার?

কোনও কোম্পানির শেয়ারের বাজারদরকে শেয়ারপ্রতি আয় দিয়ে ভাগ করলে পিই রেশিও পাওয়া যায়। যেমন, একটি শেয়ারের দাম ৫০ টাকা এবং বার্ষিক শেয়ারপ্রতি আয় ১০ টাকা হলে পিই রেশিও হবে ৫। একই খাতের দুটি কোম্পানির মধ্যে একটির পিই রেশিও ৪ এবং অন্যটির ৮ হলে প্রথমটিকে তুলনামূলক সস্তা মনে হতে পারে। কিন্তু প্রথম কোম্পানির মুনাফা যদি কমতে থাকে, খেলাপি ঋণ বাড়ে কিংবা ভবিষ্যতে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে কম পিই রেশিও বিনিয়োগকারীর জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করবে না।

অন্যদিকে, কোনও কোম্পানির আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লে, আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী থাকলে এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসার সম্ভাবনা ভালো হলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি পিই রেশিও দিতেও আগ্রহী হতে পারেন।

অর্থাৎ, শেয়ারের দাম কম কি না, সেটি দেখার পাশাপাশি কেন কম, তা বোঝা জরুরি। বিনিয়োগের মূল বিবেচনা হওয়া উচিত কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ আয় এবং বর্তমান বাজারদরের যৌক্তিকতা।

ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগের আগে সতর্কতা কেন?

ব্যাংকের মুনাফা দেখেই তার আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ঋণ থেকে কত আয় হচ্ছে, কত ঋণ নিয়মিত আদায় হচ্ছে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখা হয়েছে কি না এবং ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি কেমন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।

জুন পর্যন্ত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এ সময়ে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ।

এর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা হয়েছিল, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ।

তবে পুরো ব্যাংক খাতের এই চিত্র দিয়ে কোনো একটি ব্যাংকের অবস্থা বিচার করা যাবে না। প্রতিটি ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন আলাদাভাবে পর্যালোচনা করতে হবে।

কোনও ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও সেই আয়ের কতটা মূল ব্যাংকিং ব্যবসা থেকে এসেছে, তা দেখা প্রয়োজন। সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে আয়, ঋণের সুদ আদায়, আমানতের ব্যয় এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই মুনাফার স্থায়িত্ব বিচার করা উচিত।

একইভাবে, হিসাবের মুনাফা বাড়লেই বেশি নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয় না। মূলধনের প্রয়োজন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও লভ্যাংশের ওপর প্রভাব ফেলে।

শেয়ার কেনার আগে পাঁচটি বিষয় যাচাই করুন

১. পিই রেশিও কম হওয়ার কারণ বুঝুন

শুধু কম পিই রেশিও দেখে শেয়ার কিনবেন না। কোম্পানির আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, নাকি এককালীন আয়ের কারণে মুনাফা বেশি দেখাচ্ছে, তা যাচাই করুন। একই খাতের অন্য কোম্পানির পিই রেশিও ও আর্থিক অবস্থার সঙ্গে তুলনা করুন।

২. গত তিন বছরের মুনাফা দেখুন

গত তিন বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং সর্বশেষ ত্রৈমাসিক আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করুন। শেয়ারপ্রতি আয়, মুনাফা ও মূল ব্যবসা থেকে আয়ের প্রবণতা দেখুন। ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

৩. লভ্যাংশের ইতিহাস যাচাই করুন

গত তিন থেকে পাঁচ বছরে কোম্পানিটি কী পরিমাণ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে, তা দেখুন। শুধু ঘোষিত লভ্যাংশ নয়, প্রকৃত বিতরণের তথ্যও যাচাই করুন। শেয়ারের বাজারদর কমে যাওয়ার কারণে লভ্যাংশের হার বেশি দেখাতে পারে। তাই বেশি লভ্যাংশের হার দেখেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন না।

৪. আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষকের মতামত পড়ুন 

কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের মতামত, আর্থিক হিসাবের সীমাবদ্ধতা এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেখুন। ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন পরিস্থিতির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনাও যাচাই করুন।

৫. সব টাকা একটি শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন না

একটি কোম্পানির শেয়ার ভালো মনে হলেও তার দাম কমতে পারে। তাই নিজের আর্থিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন কোম্পানি ও খাতে বিনিয়োগ ভাগ করে রাখুন। জরুরি প্রয়োজনে লাগবে এমন অর্থ কিংবা ধার করা টাকা দিয়ে শেয়ার কেনা এড়িয়ে চলুন।

বিনিয়োগকারীরা তথ্য পাবেন কোথায়?

ডিএসইর ওয়েবসাইটে শেয়ারের বাজারদর, পিই রেশিও, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও মূল্যসংবেদনশীল তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি কোম্পানির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিজ্ঞপ্তিও যাচাই করা উচিত।

ডিএসইর পিই রেশিও এবং আর্থিক বিবরণী জমার অবস্থা দেখে প্রাথমিক তথ্য যাচাই করা যায়।

কোনও কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশিত না হলে পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, অযাচাইকৃত পরামর্শ কিংবা দ্রুত লাভের প্রলোভনেও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়।

বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তা

শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের লক্ষ্য শুধু কম দামে শেয়ার কেনা নয়; বরং যুক্তিসংগত দামে ভালো ব্যবসার অংশীদার হওয়া। কোনও শেয়ারের দাম ১০ টাকা বা ২০ টাকা হলেই সেটি সস্তা নয়। আবার বেশি দামের শেয়ার মানেই ভালো কোম্পানি—এমন ধারণাও ঠিক নয়।

যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের মতো কম পিই রেশিওর শেয়ারগুলোকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের তালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে বিনিয়োগের আগে প্রতিটি ব্যাংকের হালনাগাদ আর্থিক তথ্য, খেলাপি ঋণ, মুনাফার উৎস ও লভ্যাংশের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে।

শেয়ারবাজারে লোকসান এড়ানোর কোনও নিশ্চিত সূত্র নেই। তবে তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগ, ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুসরণ করলে ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কা কমানো সম্ভব।

এক্সপোর্ট–ইমপোর্ট

রোববার, ২৫ অক্টোবর ২০২৬


কোন কোন কোম্পানির শেয়ার কিনলে ঠকবেন না

প্রকাশের তারিখ : ২৫ অক্টোবর ২০২৬

featured Image
শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ করে মুনাফা করতে চান, কিন্তু কষ্টের জমানো টাকা হারানোর ভয় রয়েছে? কোন শেয়ার কিনলে লোকসানের ঝুঁকি কম হবে, কোন কোম্পানির শেয়ারের দাম তুলনামূলক কম এবং কোনটি নিয়মিত মুনাফা ও লভ্যাংশ দিচ্ছে—এসব প্রশ্ন ঘুরেফিরে আসে বিনিয়োগকারীদের মনে। বিশেষ করে ব্যাংকের শেয়ারের মূল্য আয় অনুপাত (পিই রেশিও) কম হলে অনেকেই সেটিকে বিনিয়োগের সুযোগ হিসেবে দেখেন। কিন্তু কম দামের শেয়ার কিনলেই কি লাভ হবে? বাস্তবতা হলো, শেয়ারবাজারে এমন কোনও শেয়ার নেই, যেটি কিনলে লোকসান হবে না—এমন নিশ্চয়তা দেওয়া যায়। বরং কম দামের আড়ালে কোনও কোম্পানির দুর্বল আর্থিক অবস্থা, আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা কিংবা ঋণ আদায়ে সংকট লুকিয়ে থাকতে পারে। আবার ভালো কোম্পানির শেয়ারও অতিরিক্ত দামে কিনলে লোকসান হতে পারে। তবে কোম্পানির আয়, মুনাফা, ঋণ, লভ্যাংশ ও আর্থিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে বিনিয়োগের ঝুঁকি কমানো সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ব্যাংক খাতের কয়েকটি শেয়ার প্রাথমিকভাবে পর্যবেক্ষণে রাখা যেতে পারে। তবে শুধু পিই রেশিও দেখে শেয়ার কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক হবে না। কম পিই রেশিওর ব্যাংক কোনগুলো? ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) তথ্য অনুযায়ী, দেওয়া হিসাবের তালিকায় যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের পিই রেশিও তুলনামূলক কম। এসব ব্যাংকের শেয়ারপ্রতি আয় ও বাজারদরের অনুপাত বিবেচনায় নিয়ে বিনিয়োগকারীরা প্রাথমিক বিশ্লেষণ শুরু করতে পারেন। ডিএসইর উল্লেখিত তথ্যে ব্যাংকগুলোর পিই রেশিও — যমুনা ব্যাংকের ২.৮৮, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ৩.২৩, সাউথইস্ট ব্যাংকের ৩.৪৫, এনসিসি ব্যাংকের ৩.৫১ এবং প্রাইম ব্যাংকের ৪.১৪। পিই রেশিও কম হওয়ায় এসব ব্যাংকের শেয়ারকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের তালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে এই তালিকা কোনও শেয়ার কেনার সুপারিশ নয়। সর্বশেষ বাজারদর, শেয়ারপ্রতি আয়ের হিসাবের সময়কাল এবং আর্থিক প্রতিবেদন অনুযায়ী পিই রেশিও পরিবর্তিত হতে পারে। বিনিয়োগের আগে হালনাগাদ তথ্য মিলিয়ে নেওয়া জরুরি। কম পিই রেশিও মানেই কি ভালো শেয়ার? কোনও কোম্পানির শেয়ারের বাজারদরকে শেয়ারপ্রতি আয় দিয়ে ভাগ করলে পিই রেশিও পাওয়া যায়। যেমন, একটি শেয়ারের দাম ৫০ টাকা এবং বার্ষিক শেয়ারপ্রতি আয় ১০ টাকা হলে পিই রেশিও হবে ৫। একই খাতের দুটি কোম্পানির মধ্যে একটির পিই রেশিও ৪ এবং অন্যটির ৮ হলে প্রথমটিকে তুলনামূলক সস্তা মনে হতে পারে। কিন্তু প্রথম কোম্পানির মুনাফা যদি কমতে থাকে, খেলাপি ঋণ বাড়ে কিংবা ভবিষ্যতে আয় কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাহলে কম পিই রেশিও বিনিয়োগকারীর জন্য সুরক্ষা নিশ্চিত করবে না। অন্যদিকে, কোনও কোম্পানির আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়লে, আর্থিক অবস্থা শক্তিশালী থাকলে এবং ভবিষ্যৎ ব্যবসার সম্ভাবনা ভালো হলে বিনিয়োগকারীরা তুলনামূলক বেশি পিই রেশিও দিতেও আগ্রহী হতে পারেন। অর্থাৎ, শেয়ারের দাম কম কি না, সেটি দেখার পাশাপাশি কেন কম, তা বোঝা জরুরি। বিনিয়োগের মূল বিবেচনা হওয়া উচিত কোম্পানির আর্থিক সক্ষমতা, ভবিষ্যৎ আয় এবং বর্তমান বাজারদরের যৌক্তিকতা। ব্যাংকের শেয়ারে বিনিয়োগের আগে সতর্কতা কেন? ব্যাংকের মুনাফা দেখেই তার আর্থিক সক্ষমতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। ঋণ থেকে কত আয় হচ্ছে, কত ঋণ নিয়মিত আদায় হচ্ছে, খেলাপি ঋণের বিপরীতে পর্যাপ্ত প্রভিশন রাখা হয়েছে কি না এবং ব্যাংকের মূলধন পরিস্থিতি কেমন—এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, জুনের শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা দাঁড়িয়েছে, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ। জুন পর্যন্ত তিন মাসে খেলাপি ঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। এ সময়ে খেলাপি ঋণের অনুপাত ছিল ৩২ দশমিক ২৬ শতাংশ। এর আগে, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরের শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ বেড়ে ৬ লাখ ৪৪ হাজার কোটি টাকা হয়েছিল, যা বিতরণ করা ঋণের প্রায় ৩৬ শতাংশ। তবে পুরো ব্যাংক খাতের এই চিত্র দিয়ে কোনো একটি ব্যাংকের অবস্থা বিচার করা যাবে না। প্রতিটি ব্যাংকের সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন আলাদাভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। কোনও ব্যাংকের মুনাফা বাড়লেও সেই আয়ের কতটা মূল ব্যাংকিং ব্যবসা থেকে এসেছে, তা দেখা প্রয়োজন। সরকারি ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ থেকে আয়, ঋণের সুদ আদায়, আমানতের ব্যয় এবং খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন—সবকিছু বিবেচনায় নিয়েই মুনাফার স্থায়িত্ব বিচার করা উচিত। একইভাবে, হিসাবের মুনাফা বাড়লেই বেশি নগদ লভ্যাংশ দেওয়ার সক্ষমতা তৈরি হয় না। মূলধনের প্রয়োজন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার শর্ত এবং ভবিষ্যৎ ক্ষতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতাও লভ্যাংশের ওপর প্রভাব ফেলে। শেয়ার কেনার আগে পাঁচটি বিষয় যাচাই করুন ১. পিই রেশিও কম হওয়ার কারণ বুঝুন শুধু কম পিই রেশিও দেখে শেয়ার কিনবেন না। কোম্পানির আয় ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে, নাকি এককালীন আয়ের কারণে মুনাফা বেশি দেখাচ্ছে, তা যাচাই করুন। একই খাতের অন্য কোম্পানির পিই রেশিও ও আর্থিক অবস্থার সঙ্গে তুলনা করুন। ২. গত তিন বছরের মুনাফা দেখুন গত তিন বছরের বার্ষিক প্রতিবেদন এবং সর্বশেষ ত্রৈমাসিক আর্থিক বিবরণী পর্যালোচনা করুন। শেয়ারপ্রতি আয়, মুনাফা ও মূল ব্যবসা থেকে আয়ের প্রবণতা দেখুন। ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি, মূলধন পর্যাপ্ততা এবং ঋণ আদায়ের সক্ষমতা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। ৩. লভ্যাংশের ইতিহাস যাচাই করুন গত তিন থেকে পাঁচ বছরে কোম্পানিটি কী পরিমাণ নগদ লভ্যাংশ দিয়েছে, তা দেখুন। শুধু ঘোষিত লভ্যাংশ নয়, প্রকৃত বিতরণের তথ্যও যাচাই করুন। শেয়ারের বাজারদর কমে যাওয়ার কারণে লভ্যাংশের হার বেশি দেখাতে পারে। তাই বেশি লভ্যাংশের হার দেখেই বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত নেবেন না। ৪. আর্থিক প্রতিবেদন ও নিরীক্ষকের মতামত পড়ুন  কোম্পানির বার্ষিক প্রতিবেদনে নিরীক্ষকের মতামত, আর্থিক হিসাবের সীমাবদ্ধতা এবং গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দেখুন। ব্যাংকের ক্ষেত্রে খেলাপি ঋণ, প্রভিশন ঘাটতি ও মূলধন পরিস্থিতির পাশাপাশি নিয়ন্ত্রক সংস্থার নির্দেশনাও যাচাই করুন। ৫. সব টাকা একটি শেয়ারে বিনিয়োগ করবেন না একটি কোম্পানির শেয়ার ভালো মনে হলেও তার দাম কমতে পারে। তাই নিজের আর্থিক সামর্থ্য ও ঝুঁকি নেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী বিভিন্ন কোম্পানি ও খাতে বিনিয়োগ ভাগ করে রাখুন। জরুরি প্রয়োজনে লাগবে এমন অর্থ কিংবা ধার করা টাকা দিয়ে শেয়ার কেনা এড়িয়ে চলুন। বিনিয়োগকারীরা তথ্য পাবেন কোথায়? ডিএসইর ওয়েবসাইটে শেয়ারের বাজারদর, পিই রেশিও, কোম্পানির আর্থিক প্রতিবেদন ও মূল্যসংবেদনশীল তথ্য পাওয়া যায়। পাশাপাশি কোম্পানির নিজস্ব ওয়েবসাইটে প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন এবং বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) বিজ্ঞপ্তিও যাচাই করা উচিত। ডিএসইর পিই রেশিও এবং আর্থিক বিবরণী জমার অবস্থা দেখে প্রাথমিক তথ্য যাচাই করা যায়। কোনও কোম্পানির সর্বশেষ আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশিত না হলে পুরোনো তথ্যের ভিত্তিতে বিনিয়োগ করা ঝুঁকিপূর্ণ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজব, অযাচাইকৃত পরামর্শ কিংবা দ্রুত লাভের প্রলোভনেও সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বিনিয়োগকারীদের জন্য বার্তা শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের লক্ষ্য শুধু কম দামে শেয়ার কেনা নয়; বরং যুক্তিসংগত দামে ভালো ব্যবসার অংশীদার হওয়া। কোনও শেয়ারের দাম ১০ টাকা বা ২০ টাকা হলেই সেটি সস্তা নয়। আবার বেশি দামের শেয়ার মানেই ভালো কোম্পানি—এমন ধারণাও ঠিক নয়। যমুনা ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, সাউথইস্ট ব্যাংক, এনসিসি ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের মতো কম পিই রেশিওর শেয়ারগুলোকে প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের তালিকায় রাখা যেতে পারে। তবে বিনিয়োগের আগে প্রতিটি ব্যাংকের হালনাগাদ আর্থিক তথ্য, খেলাপি ঋণ, মুনাফার উৎস ও লভ্যাংশের সক্ষমতা যাচাই করতে হবে। শেয়ারবাজারে লোকসান এড়ানোর কোনও নিশ্চিত সূত্র নেই। তবে তথ্য যাচাই করে বিনিয়োগ, ঝুঁকি ভাগ করে নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুসরণ করলে ভুল সিদ্ধান্তের আশঙ্কা কমানো সম্ভব।

এক্সপোর্ট–ইমপোর্ট

সম্পাদক ও প্রকাশক: জাকির হোসেন শাহেদ
কপিরাইট © ২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত এক্সপোর্ট–ইমপোর্ট
কোন কোন কোম্পানির শেয়ার কিনলে ঠকবেন না
0:00 0:00
1.0x