এক্সপোর্ট–ইমপোর্ট

সাভার-আশুলিয়ায় গ্যাস-সংকট: উৎপাদন অর্ধেকে, বেড়েছে ব্যয়

গ্যাস-সংকটের কারণে ঢাকার সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পকারখানাগুলোতে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস না পাওয়ায় অনেক কারখানাকে বয়লার ও জেনারেটর সচল রাখতে ডিজেল, সিএনজি ও এলপিজির মতো বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি কমেছে উৎপাদনের পরিমাণ। কোনো কোনো কারখানায় উৎপাদন অর্ধেকের কাছাকাছি নেমে এসেছে।সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত এক সপ্তাহের তুলনায় বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। তবে অধিকাংশ শিল্পকারখানা এখনো চাহিদা অনুযায়ী গ্যাস পাচ্ছে না।তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির সাভার ও আশুলিয়া জোনাল বিক্রয় অফিস সূত্রে জানা গেছে, সাভার ও আশুলিয়ায় ৭০৭টি শিল্পকারখানায় তিতাস গ্যাসের সংযোগ রয়েছে। এসব কারখানাসহ অন্যান্য প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে প্রতিদিন অন্তত ২৮ কোটি ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হয়। বিপরীতে সরবরাহ অনেক কম।সপ্তাহখানেক আগেও আশুলিয়া এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ ছিল প্রায় ১০ কোটি ঘনফুট। গত এক সপ্তাহে তা বেড়ে ১৩ থেকে ১৫ কোটি ঘনফুটে পৌঁছেছে। তারপরও চাহিদার তুলনায় বড় ধরনের ঘাটতি রয়ে গেছে।গত সোমবার বেলা ১১টার দিকে সাভার ও আশুলিয়া এলাকায় গ্যাসের সরবরাহ পাওয়া যায় প্রায় ১৪ কোটি ঘনফুট। তিতাসের সাভার জোনাল বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ হাসান আল মামুন বলেন, চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে। ফলে শিল্পকারখানায় প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। কম চাপের কারণে উৎপাদন কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।সাভার পৌরসভার ছোট বলিমেহের এলাকার পাকিজা ডাইং অ্যান্ড প্রিন্টিং ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডেও গ্যাসের কম চাপের কারণে উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। কারখানা কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, স্বাভাবিক উৎপাদন বজায় রাখতে প্রতিদিন কমপক্ষে ৫ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে চাপ ২ পিএসআই থেকে অনেক সময় ১ পিএসআইয়ের নিচে নেমে যায়।কারখানাটির কর্মকর্তারা জানান, উৎপাদন চালু রাখতে বয়লার ও জেনারেটরের জন্য ডিজেল, সিএনজি ও এলপিজি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে প্রায় ২৫ শতাংশ। অতিরিক্ত জ্বালানি খরচের কারণে পণ্যের উৎপাদন ব্যয় ও দাম—দুটিই বাড়ছে। অনেক সময় উৎপাদন চালু রাখতেই লোকসান গুনতে হচ্ছে।কারখানাটির এক পদস্থ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রায় তিন মাস আগেও প্রতিদিন ১ লাখ ৮০ হাজার থেকে ২ লাখ গজ কাপড় উৎপাদন হতো। এখন গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কমে যাওয়ায় দৈনিক উৎপাদন নেমে এসেছে প্রায় ১ লাখ থেকে ১ লাখ ১০ হাজার গজে। অর্থাৎ তিন মাসের ব্যবধানে দৈনিক উৎপাদন প্রায় অর্ধেকে নেমেছে।সাভারের ওলাইল এলাকার আল-মুসলিম গ্রুপের কারখানাগুলোতেও গ্যাস-সংকটের কারণে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, স্বাভাবিক উৎপাদনের জন্য কমপক্ষে ২০ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন। বর্তমানে চাপ ৬ পিএসআই থেকে অনেক সময় ৪ পিএসআইয়ের নিচে নেমে যায়।একজন পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, সপ্তাহখানেক আগে গ্যাসের চাপ আরও কম ছিল। বর্তমানে কিছুটা বেড়েছে। তবে চাপ বাড়লেও কারখানা সচল রাখতে এখনো ডিজেল, সিএনজি ও এলপিজির মতো বিকল্প জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।সাভারের চামড়াশিল্প নগরের কারখানাগুলোতেও গ্যাস-সংকটের প্রভাব পড়েছে। শিল্পনগরীর ১৪৫টি কারখানার মধ্যে প্রায় অর্ধেক বর্তমানে গ্যাস পাচ্ছে না। আর বাকি কারখানাগুলো চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক গ্যাস পাচ্ছে।বাংলাদেশ ট্যানার্স অ্যাসোসিয়েশনের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান বলেন, সপ্তাহখানেক আগে শিল্পনগরীর কারখানাগুলোতে গ্যাস সরবরাহ প্রায় বন্ধ ছিল। এক সপ্তাহ ধরে প্রায় অর্ধেক কারখানা চাহিদার অর্ধেক গ্যাস পাচ্ছে। এতে কারখানাগুলোর উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।তিতাসের সাভার জোনাল বিক্রয় অফিসের ব্যবস্থাপক আব্দুল্লাহ হাসান আল মামুন বলেন, চামড়াশিল্প নগরীতে বর্তমানে প্রতিদিন ২ থেকে ৩ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এই সরবরাহ চাহিদার তুলনায় প্রায় অর্ধেক।গ্যাস-সংকটের প্রভাব শুধু শিল্পকারখানার উৎপাদন ও ব্যয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, শ্রমিকদের কাজের ওপরও এর প্রভাব পড়ছে বলে জানিয়েছেন শ্রমিকনেতারা।বাংলাদেশ গার্মেন্টস ও সোয়েটার্স শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের আইনবিষয়ক সম্পাদক খায়রুল মামুন মিন্টু বলেন, সাভার ও আশুলিয়ার সাত শতাধিক শিল্পকারখানা গ্যাস-সংকটের কারণে কমবেশি ক্ষতির মুখে পড়েছে। শিল্পকারখানার উৎপাদন স্বাভাবিক রাখতে পর্যাপ্ত গ্যাসের চাপ নিশ্চিত করা না গেলে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।বিজিএমইএর সহসভাপতি ও সফটেক্স কটন লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. রেজোয়ান সেলিম বলেন, সংকট এখনো রয়েছে। তবে এক সপ্তাহ আগের তুলনায় বর্তমানে গ্যাসের সরবরাহ কিছুটা বেড়েছে। সরবরাহ আরও বাড়লে শিল্পকারখানাগুলোর সংকটও কিছুটা কমতে পারে।গ্যাস-সংকটের বিষয়ে তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন পিএলসির সাভার আঞ্চলিক বিক্রয় বিভাগের উপমহাব্যবস্থাপক (ডিজিএম) প্রকৌশলী মনিরুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘গ্যাস নাই, তাই দিতে পারি না। সাভার ও আশুলিয়ার শিল্পাঞ্চলে গ্যাসের সরবরাহ ও চাপ কবে নাগাদ পুরোপুরি স্বাভাবিক হবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।’

সাভার-আশুলিয়ায় গ্যাস-সংকট: উৎপাদন অর্ধেকে, বেড়েছে ব্যয়