ভারতে কিউআর কোড স্ক্যান করে মুহূর্তেই টাকা পাঠানো এখন দৈনন্দিন লেনদেনের অংশ হয়ে উঠেছে। দোকান, রেস্তোরাঁ, ট্যাক্সি কিংবা ছোট ব্যবসা—প্রায় সব ক্ষেত্রেই নগদের বিকল্প হিসেবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ইউনিফায়েড পেমেন্টস ইন্টারফেস বা ইউপিআই। এতদিন গ্রাহক ও অধিকাংশ বিক্রেতার জন্য এ সেবা কার্যত বিনামূল্যেই ছিল। তবে সেই ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনার উদ্যোগ নিয়েছে ভারত সরকার।
নতুন প্রস্তাব অনুযায়ী, ইউপিআইয়ের মাধ্যমে বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক লেনদেনে মার্চেন্টদের কাছ থেকে ফি আদায়ের সুযোগ দেওয়া হতে পারে ব্যাংক ও পেমেন্ট সংস্থাগুলোকে। তবে এখনো ফি-র হার বা এটি কোন কোন ক্ষেত্রে কার্যকর হবে, তা চূড়ান্ত হয়নি।
সরকারি সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আলোচনায় থাকা একটি প্রস্তাবে বড় প্রতিষ্ঠান ও তুলনামূলক বড় অঙ্কের কেনাকাটায় ০.৩ শতাংশ থেকে ০.৫ শতাংশ পর্যন্ত মার্চেন্ট ডিসকাউন্ট রেট বা এমডিআর আরোপের কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন ছোটখাটো কেনাকাটা এবং একজন ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তির অ্যাকাউন্টে টাকা পাঠানোর ক্ষেত্রে কোনো ফি আরোপের পরিকল্পনা নেই।
একটি প্রস্তাব অনুযায়ী, ২ হাজার রুপির বেশি লেনদেনের ক্ষেত্রে এই ফি প্রযোজ্য হতে পারে। এতে সাধারণ ছোট লেনদেনগুলো আগের মতোই বিনামূল্যে রাখার সুযোগ থাকবে। ফলে বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক লেনদেন থেকে ব্যাংক ও পেমেন্ট সংস্থাগুলো নতুন করে রাজস্ব আয় করতে পারবে।
২০১৬ সালে চালু হওয়ার পর ইউপিআই দ্রুত ভারতের অন্যতম বৃহৎ তাৎক্ষণিক অর্থ স্থানান্তর ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই মাসেই ইউপিআইয়ের মাধ্যমে ২৩ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ২ হাজার ৩৬০ কোটি লেনদেন হয়েছে। এসব লেনদেনের মোট আর্থিক মূল্য ছিল ২৯ দশমিক ৮৭ ট্রিলিয়ন রুপি, যা প্রায় ৩১৩ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান।
ফোনপে ও গুগল পের মতো ফিনটেক প্ল্যাটফর্ম ইউপিআই লেনদেনের বড় অংশ পরিচালনা করে। সর্বশেষ অর্থবছরে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে লেনদেনের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৪১ দশমিক ৬ বিলিয়ন। বর্তমানে ৫৫ কোটিরও বেশি মানুষ এই ব্যবস্থা ব্যবহার করছেন। ভারতের বাইরেও অন্তত ১১টি দেশে কোনো না কোনোভাবে ইউপিআইভিত্তিক পেমেন্ট সুবিধা চালু হয়েছে।
ইউপিআইয়ের অন্যতম বড় সাফল্য হলো এর উন্মুক্ত কাঠামো। একটি নির্দিষ্ট অ্যাপের ওপর নির্ভর না করে বিভিন্ন ব্যাংক ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান একই নেটওয়ার্ক ব্যবহার করে গ্রাহকদের সেবা দিতে পারে। পুরো ব্যবস্থাটি পরিচালনা করে ন্যাশনাল পেমেন্টস করপোরেশন অব ইন্ডিয়া বা এনপিসিআই।
ইউপিআইয়ের বিস্তারে বড় ভূমিকা রেখেছে ছোট ব্যবসায়ী ও অনানুষ্ঠানিক খাতের অংশগ্রহণ। সবজি বিক্রেতা, ট্যাক্সিচালক কিংবা ফুটপাতের দোকানিকে টাকা নেওয়ার জন্য দামি পস মেশিন কিনতে হয়নি। একটি কিউআর কোড প্রদর্শন করলেই তারা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণ করতে পেরেছেন।
এ ছাড়া কোনো অতিরিক্ত ফি না থাকায় ব্যবসায়ীরাও গ্রাহকদের ডিজিটাল পেমেন্টে নিরুৎসাহিত করেননি। ফলে শহর থেকে ছোট শহর ও গ্রাম পর্যন্ত দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে ইউপিআই।
অর্থনীতিবিদদের আশঙ্কা, প্রস্তাবিত ফি যদি শুধু বড় প্রতিষ্ঠান ও বড় অঙ্কের লেনদেনে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে এর প্রভাব তুলনামূলক কম হবে। কিন্তু ছোট ও অনানুষ্ঠানিক ব্যবসায়ীদের ওপর ফি চাপানো হলে ইউপিআইয়ের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
ব্যবহারকারীর কাছে ইউপিআই বিনামূল্যের মনে হলেও এই বিশাল ডিজিটাল অবকাঠামো পরিচালনায় বিপুল অর্থ ব্যয় হয়। সার্ভার পরিচালনা, লেনদেন নিষ্পত্তি, প্রতারণা শনাক্তকরণ এবং সাইবার হামলা প্রতিরোধে নিয়মিত বিনিয়োগ প্রয়োজন।
এতদিন এসব ব্যয়ের একটি বড় অংশ সরকারি ভর্তুকির মাধ্যমে সামাল দেওয়া হয়েছে। তবে ইউপিআইয়ের ব্যবহার যত বাড়ছে, দীর্ঘমেয়াদে এই ব্যয় বহন করা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
ভারতের কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়ার গভর্নর সঞ্জয় মালহোত্রার বক্তব্য, এই সেবার পরিচালন ব্যয় শেষ পর্যন্ত কাউকে না কাউকে বহন করতে হবে।
প্রস্তাবিত ফি ব্যবস্থা কার্যকর হলে বড় অঙ্কের বাণিজ্যিক লেনদেন থেকে ব্যাংক ও পেমেন্ট সংস্থাগুলোর জন্য বছরে প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত নতুন রাজস্ব তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ডিজিটাল পেমেন্ট ব্যবস্থায় ফি আরোপের ক্ষেত্রে ব্রাজিলের উদাহরণও আলোচনায় রয়েছে। দেশটির ‘পিক্স’ নামের তাৎক্ষণিক পেমেন্ট ব্যবস্থা সাধারণ মানুষের জন্য বিনামূল্যে হলেও ব্যবসায়িক লেনদেনে সামান্য ফি নেওয়া হয়।
তারপরও পিক্সের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। প্রতি মাসে প্রায় ১৪ কোটি মানুষ এবং ১ কোটি ৪০ লাখ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান এই ব্যবস্থা ব্যবহার করে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভারতের ক্ষেত্রেও বড় বাণিজ্যিক লেনদেনে সীমিত ফি আরোপ করা হলে ইউপিআইয়ের আর্থিক স্থায়িত্ব বাড়তে পারে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে ডিজিটাল পেমেন্ট অবকাঠামো আরও শক্তিশালী করার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংস্থান হতে পারে।
তবে ফি আরোপের সম্ভাবনা নিয়ে ব্যবহারকারীদের মধ্যে উদ্বেগও রয়েছে। ২০২৪ সালে লোকালসার্কেলসের এক জরিপে ৭৫ শতাংশ ইউপিআই ব্যবহারকারী জানিয়েছিলেন, ফি আরোপ করা হলে তারা ইউপিআই ব্যবহার বন্ধ করে দিতে পারেন। বিপরীতে মাত্র ২২ শতাংশ ব্যবহারকারী ফি দিয়ে সেবা ব্যবহারে আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বড় শপিং মল বা বড় প্রতিষ্ঠানে সামান্য ফি চালু হলে হয়তো ইউপিআইয়ের ব্যবহার উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে না। কিন্তু এই ফি যদি ছোট ব্যবসায়ীদের ওপরও চাপানো হয়, তাহলে তারা ডিজিটাল পেমেন্ট গ্রহণে অনাগ্রহী হয়ে উঠতে পারেন।
ফলে ভারতের সামনে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হলো—ইউপিআইকে সাধারণ মানুষের জন্য সহজ ও বিনামূল্যের সেবা
বিষয় : লেনদেন ভারত বিশ্ব অর্থনীতি

সোমবার, ১৭ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৭ আগস্ট ২০২৬
