চট্টগ্রামে তীব্র গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে শিল্প খাতে। প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ কম গ্যাস সরবরাহের কারণে বড় শিল্পকারখানাগুলোর উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। কোথাও উৎপাদন সীমিত করা হয়েছে, আবার কোথাও গ্যাসের বিকল্প হিসেবে তিন গুণ বেশি ব্যয়বহুল জ্বালানি ব্যবহার করতে হচ্ছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর প্রভাব রপ্তানি, উৎপাদন ও সরবরাহব্যবস্থায়ও পড়বে।
শিল্প খাতের পাশাপাশি আবাসিক গ্রাহক, সিএনজি ফিলিং স্টেশন, হোটেল-রেস্তোরাঁ এবং নগরবাসীর দৈনন্দিন জীবনও গ্যাস-সংকটে মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে।
চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হক বলেন, গ্যাস-সংকটের কারণে শিল্পকারখানার উৎপাদন উদ্বেগজনক হারে কমেছে। তার হিসাবে, বর্তমানে উৎপাদন ৩০ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।
বিএসআরএমের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) তপন সেনগুপ্ত বলেন, গ্যাসের চাপ কমে গেলে উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা সম্ভব হয় না। তখন বাধ্য হয়ে ফার্নেস অয়েল ব্যবহার করতে হয়, যার খরচ গ্যাসের তুলনায় তিন গুণেরও বেশি। এতে উৎপাদন ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি কারখানার কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (কেজিডিসিএল) সূত্রে জানা গেছে, চট্টগ্রাম অঞ্চলে দৈনিক গ্যাসের চাহিদা প্রায় ৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফ)। তবে গত শনিবার সরবরাহ ছিল ২১৭ মিলিয়ন ঘনফুট, রোববার তা কমে প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটে নেমে আসে। সর্বশেষ সোমবার সরবরাহ দাঁড়ায় মাত্র ১৯৪ মিলিয়ন ঘনফুট। অর্থাৎ প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
এই সংকটের প্রভাব পড়েছে কেজিডিসিএলের আওতাধীন ৬ লাখ ২ হাজার ৪০৬টি গ্যাস সংযোগে। এর মধ্যে রয়েছে ৫ লাখ ৯৮ হাজার ৬টি আবাসিক, ১ হাজার ১৯৯টি শিল্প, ২ হাজার ৯১১টি বাণিজ্যিক সংযোগ, ২০৯টি ক্যাপটিভ পাওয়ার ইউনিট, ৭০টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন, পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং চারটি সার কারখানা।
কেজিডিসিএলের উপমহাব্যবস্থাপক (প্রকৌশল) মোহাম্মদ রফিক খান বলেন, জাতীয় গ্রিড থেকে যে পরিমাণ গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে, সেটিই বিতরণ করা হচ্ছে। বড় শিল্প গ্রাহকদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রেখে জরুরি প্রয়োজন ছাড়া গ্যাসের ব্যবহার সীমিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, গত ২১ জুলাই মহেশখালীর এক্সিলারেট এনার্জির ভাসমান এলএনজি টার্মিনালে অগ্নিকাণ্ড ও কারিগরি ত্রুটির পর থেকেই গ্যাস সরবরাহ কমতে শুরু করে। ১ আগস্টের পর পরিস্থিতি আরও অবনতি হয়। বর্তমানে সামিটের ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে গ্যাস সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
গ্যাসের স্বল্পচাপের কারণে নগরীর সিএনজি ফিলিং স্টেশনগুলোতে দীর্ঘ লাইনের সৃষ্টি হয়েছে। অটোরিকশাচালক মো. সেলিম জানান, সোমবার রাত ৮টায় লাইনে দাঁড়িয়ে মঙ্গলবার সকাল ৮টায় গ্যাস নিতে পেরেছেন। এর প্রভাব পড়েছে যাত্রীভাড়াতেও। নগরের বাসিন্দা মো. ছাদুর রশিদ বলেন, রেলস্টেশন থেকে চকবাজার ডিসি রোড পর্যন্ত অটোরিকশা ভাড়া ১০০ টাকা থেকে বেড়ে ১৮০ টাকায় পৌঁছেছে।
চট্টগ্রাম অটোরিকশা-অটোটেম্পু শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. হারুনুর রশিদ বলেন, গ্যাস-সংকটে হাজারো সিএনজিচালিত অটোরিকশার চালক চরম দুর্ভোগে পড়েছেন। দ্রুত সংকট নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ফিলিং স্টেশন সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বাভাবিক সময়ে গ্যাসের চাপের রিডিং যেখানে প্রায় ২২০ থাকে, বর্তমানে তা ১৫০ থেকে ১৭০-এর মধ্যে ওঠানামা করছে। ফলে প্রতিটি গাড়িতে গ্যাস সরবরাহে আগের তুলনায় অনেক বেশি সময় লাগছে। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বিভ্রাট যোগ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।
গ্যাস-সংকটের সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসিক গ্রাহকেরাও। নগরের চকবাজার এলাকার বাসিন্দা তাহমিনা আফরোজ বলেন, কয়েক দিন ধরেই চুলায় গ্যাসের চাপ খুব কম ছিল। মঙ্গলবার সকাল থেকে একেবারেই গ্যাস না থাকায় বাধ্য হয়ে বাড়তি খরচে হোটেল থেকে খাবার কিনে আনতে হয়েছে।

বৃহস্পতিবার, ০৬ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৬ আগস্ট ২০২৬
