বৈধভাবে স্বর্ণ আমদানি বাড়ানো, চোরাচালান রোধ, রাজস্ব আদায় বৃদ্ধি এবং স্বর্ণালংকার রপ্তানি সম্প্রসারণের লক্ষ্য নিয়ে ‘স্বর্ণ নীতিমালা-২০১৮ (সংশোধিত)-২০২৬’-এর খসড়া চূড়ান্ত করার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। প্রস্তাবিত নীতিমালায় স্বর্ণ আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রিসহ পুরো সরবরাহব্যবস্থাকে সমন্বিত নজরদারির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক বিশেষ পর্যালোচনা সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা হয়। সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির আগামী রোববারের মধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সরকারি সংস্থা ও অংশীজনদের খসড়া নীতিমালার বিষয়ে লিখিত মতামত দেওয়ার নির্দেশ দেন।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) সভাপতি এনামুল হক খান, রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ হাসান আরিফ, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থা এবং স্বর্ণ খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
সভায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, দেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও কার্যকর নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অভাবে স্বর্ণ খাত এখনো পুরোপুরি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। ফলে এ খাতের সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হয়নি।
সরকার স্বর্ণ ব্যবসাকে অন্যান্য শিল্পের মতো একটি পূর্ণাঙ্গ আইনি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় এনে স্বীকৃত শিল্প হিসেবে গড়ে তুলতে চায় বলেও জানান তিনি।
প্রস্তাবিত নীতিমালায় বৈধভাবে আমদানি করা স্বর্ণের আমদানি, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিক্রির প্রতিটি ধাপ সমন্বিত নজরদারির আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে। এর মাধ্যমে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো স্বর্ণের উৎস, মজুত ও লেনদেনের তথ্য সহজে পর্যবেক্ষণ করতে পারবে। এতে বাজারে স্বচ্ছতা বাড়ার পাশাপাশি অবৈধ বাণিজ্য ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণে সুবিধা হবে বলে মনে করছে সরকার।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, স্বর্ণ খাতকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বৈধ আমদানি, রাজস্ব আদায় এবং স্বর্ণের মজুত ও লেনদেনে স্বচ্ছতা বাড়বে। ব্যবসায়ীরা নিয়ম অনুযায়ী শুল্ক-কর পরিশোধ করবেন এবং সরকারও ব্যবসাবান্ধব বিধিবিধান নিশ্চিত করবে।
স্বর্ণকে মূল্য সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পাশাপাশি উল্লেখযোগ্য পরিমাণ স্বর্ণ সংরক্ষণ করে। দেশে বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ বৈধভাবে আমদানি হয়ে তা যদি দেশের ভেতরেই থাকে, তাহলে সেটিও দেশের অভ্যন্তরে সম্পদ ও মূল্য সংরক্ষণের একটি মাধ্যম হিসেবে কাজ করবে।
চোরাচালান কমাতে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দেশের বাজারে স্বর্ণের দাম নির্ধারণের ওপরও গুরুত্ব দেন বাণিজ্যমন্ত্রী। তিনি বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় দামের বড় পার্থক্য থাকলে অবৈধ আমদানি ও চোরাচালানের ঝুঁকি বেড়ে যায়। তাই শুল্ক ও কর কাঠামো নির্ধারণের সময় দুবাইয়ের মতো আন্তর্জাতিক স্বর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্রগুলোর বাজার পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।
শুধু স্বর্ণ আমদানি নয়, দেশে মূল্য সংযোজন করে স্বর্ণালংকার তৈরি ও রপ্তানির সম্ভাবনাকেও নতুন নীতিমালায় গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। যৌক্তিক শুল্কে কাঁচামাল আমদানির সুযোগ তৈরি করা গেলে স্থানীয় কারিগর ও উদ্যোক্তারা আন্তর্জাতিক বাজারের জন্য প্রতিযোগিতামূলক স্বর্ণালংকার তৈরি করতে পারবেন বলে জানান তিনি।
বাংলাদেশে বিয়ে ও বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে স্বর্ণের চাহিদা বেশি উল্লেখ করে বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, যুগোপযোগী ও সুসংগঠিত নীতিমালা কার্যকর হলে বাজারে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং ভোক্তারা তুলনামূলক ন্যায্য দামে স্বর্ণ কেনার সুযোগ পাবেন।
নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে ভারতসহ বিশ্বের তিন থেকে চারটি প্রধান স্বর্ণালংকার রপ্তানিকারক দেশের স্বর্ণ আমদানি পদ্ধতি, শুল্ক কাঠামো, সংরক্ষণব্যবস্থা ও রপ্তানি প্রণোদনা পর্যালোচনা করবে সরকার। পাশাপাশি নীতিমালা বাস্তবায়নে সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ ও ঝুঁকি চিহ্নিত করে লিখিত সুপারিশ দিতে এনবিআর, বাংলাদেশ ব্যাংকসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে বলা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য নতুন কোনো জটিলতা তৈরি করা নয়; বরং জাতীয় স্বার্থ বিবেচনায় একটি স্বচ্ছ, টেকসই ও বাস্তবসম্মত নীতিগত কাঠামো তৈরি করা। অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনার পর প্রয়োজন হলে নীতিমালা চূড়ান্ত করার আগে আরও পরামর্শমূলক বৈঠক করা হবে।

বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ আগস্ট ২০২৬
