কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নশীল দেশগুলোকে এমন দ্রুত অগ্রগতির সুযোগ দিতে পারে, যা প্রচলিত পথে অর্জন করতে এক শতাব্দী পর্যন্ত সময় লাগতে পারত। তবে এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, দক্ষ জনশক্তি ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছে বিশ্বব্যাংক।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের ‘ওয়ার্ল্ড ডেভেলপমেন্ট রিপোর্ট ২০২৬: দ্য প্রমিজ অব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, উচ্চ আয়ের দেশগুলোর তুলনায় নিম্ন ও মধ্যম আয়ের দেশগুলোতে জেনারেটিভ এআইয়ের কারণে চাকরি স্বয়ংক্রিয় হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেক কম। এসব দেশে বিদ্যমান চাকরির ৪ দশমিক ৫ শতাংশ অটোমেশনের ঝুঁকিতে রয়েছে। বিপরীতে উচ্চ আয়ের দেশগুলোতে এ হার ১৪ দশমিক ২ শতাংশ।
তবে এআইয়ের মাধ্যমে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্যও উল্লেখযোগ্য। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল অর্থনীতির ১৬ দশমিক ২ শতাংশ চাকরিতে এআই উৎপাদনশীলতা বাড়াতে পারে। উচ্চ আয়ের দেশগুলোর ক্ষেত্রে সম্ভাব্য এই হার ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ।
বিশ্বব্যাংকের মতে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআইয়ের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা মানুষের চাকরি কেড়ে নেওয়া নয়; বরং মানুষের সক্ষমতা বাড়িয়ে দেওয়া।
বিশ্বব্যাংক গ্রুপের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্রধান অর্থনীতিবিদ ইন্দরমিত গিল বলেন, এআই উন্নয়নশীল অর্থনীতির সামনে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলেছে। এর সুফল পেতে সব সময় বড় ডেটা সেন্টার বা বিশাল আকারের এআই মডেলের প্রয়োজন নেই। স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছোট ও কম খরচের এআই টুল দিয়েও স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, বিচারিক সেবা ও কৃষি সম্প্রসারণের মতো গুরুত্বপূর্ণ সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এআই ইতোমধ্যে ব্যক্তি, ব্যবসা ও সরকারকে তথ্য বিশ্লেষণ, পূর্বাভাস, সমস্যা সমাধান এবং বৃহৎ পরিসরে সেবা প্রদানে সহায়তা করছে। চিকিৎসকদের রোগ নির্ণয়, কৃষকদের ফসলসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উৎপাদনশীলতা বাড়াতেও এ প্রযুক্তি ভূমিকা রাখতে পারে।
সরকারি পর্যায়েও কর আদায়, সামাজিক নিরাপত্তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষার মান উন্নয়নে এআই ব্যবহারের সুযোগ রয়েছে।
তবে এআইয়ের সুফল পেতে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে বেশ কিছু বড় চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হবে। অনেক দেশে এখনো পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ, নির্ভরযোগ্য ইন্টারনেট, তথ্যভান্ডার, দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। এসব সমস্যা দূর করা না গেলে এআই প্রযুক্তি বরং দেশগুলোর মধ্যে বৈষম্য আরও বাড়িয়ে দিতে পারে।
বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে এআই গ্রহণের জন্য তিন ধাপের কৌশলের কথা বলা হয়েছে। প্রথমে বিদ্যমান এআই সরঞ্জাম গ্রহণ, এরপর সেগুলোকে স্থানীয় বাস্তবতার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়া এবং দীর্ঘমেয়াদে উন্নত বা ফ্রন্টিয়ার এআই তৈরির সক্ষমতা অর্জন করতে হবে।
প্রতিবেদনের পরিচালক গৌরব নায়ার বলেন, উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য এআইয়ের সুযোগ কাজে লাগানোর সময় সীমিত। যেসব দেশ এখনই বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট সংযোগ, দক্ষতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ভিত্তি তৈরি করবে, তারা জনগণের কল্যাণে এআই গ্রহণ ও ব্যবহারে এগিয়ে থাকবে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এআই ব্যবহারের পাশাপাশি স্থানীয় ভাষা ও তথ্যভান্ডার সমৃদ্ধ করা, উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি এবং সফল প্রযুক্তি উদ্যোগ সম্প্রসারণে কার্যকর নীতিমালা প্রয়োজন।
বিশ্বব্যাংকের মতে, এআই ব্যবহারে জনগণের আস্থা অর্জনও গুরুত্বপূর্ণ। তাই অতিরিক্ত কঠোর নিয়ন্ত্রণের পরিবর্তে দায়িত্বশীল উদ্ভাবন, স্বেচ্ছাসেবী মানদণ্ড ও ধাপে ধাপে নীতিমালা প্রণয়নের মাধ্যমে নিরাপদ এবং কার্যকর এআই ব্যবহারের পরিবেশ তৈরি করা উচিত।

বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৮ আগস্ট ২০২৬
