চোরাচালান, আমদানি-রপ্তানি আইন লঙ্ঘনসহ বিভিন্ন অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্ত পণ্য নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে নতুন স্থায়ী আদেশ জারি করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। নতুন আদেশে নিলামের পাশাপাশি নির্দিষ্ট শ্রেণির পণ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে বিক্রি, হস্তান্তর এবং প্রয়োজনে ধ্বংসের পদ্ধতিও নির্ধারণ করা হয়েছে।
সাধারণ নিলামযোগ্য পণ্য বিক্রির ক্ষেত্রে এনবিআরের চালু করা ই-নিলাম বা লাইভ ই-অকশন ব্যবস্থাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। ই-নিলাম সম্ভব না হলে প্রকাশ্য, তাৎক্ষণিক বা সিল্ড নিলামের মাধ্যমে পণ্য বিক্রির সুযোগ থাকবে।
সোমবার এনবিআরের কাস্টমস শাখা থেকে ‘অখালাসকৃত বা চোরাচালানের অভিযোগে আটক ও বাজেয়াপ্তকৃত পণ্যের নিষ্পত্তি পদ্ধতি সংক্রান্ত স্থায়ী আদেশ, ২০২৬’ জারি করা হয়। এতে স্বাক্ষর করেন এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব।
নতুন আদেশের মাধ্যমে ২০২৫ সালের ২ জুলাই জারি করা এ-সংক্রান্ত আগের স্থায়ী আদেশ বাতিল করা হয়েছে। কাস্টমস আইন, ২০২৩-এর সংশ্লিষ্ট ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নতুন আদেশটি জারি করা হয়েছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কাস্টমস, বিজিবি, পুলিশ, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, কোস্টগার্ড ও আনসারসহ সংশ্লিষ্ট আটককারী কর্তৃপক্ষকে জব্দ করা পণ্য নিকটস্থ কাস্টমস গুদামে জমা দিতে হবে।
মূল্যবান ধাতু, হীরা, জুয়েলারি ও বৈদেশিক মুদ্রার ক্ষেত্রে স্বীকৃত যাচাইকারী প্রতিষ্ঠানের সনদ দিতে হবে। সনদ পাওয়া না গেলে এসব পণ্য সাময়িকভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখার সুযোগ রয়েছে।
সাধারণ পণ্য সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা এবং মূল্যবান ধাতু ও বৈদেশিক মুদ্রা সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত গ্রহণ করা হবে। পচনশীল পণ্য অফিস সময়ের পরও গ্রহণ করা যাবে।
পণ্য জমা দেওয়ার সময় আটককারী কর্তৃপক্ষকে তিন প্রস্থ আটক প্রতিবেদন দিতে হবে। গুদাম কর্মকর্তা পণ্যের মডেল, ব্র্যান্ড, পরিমাণ, মূল্যসহ প্রয়োজনীয় তথ্য রেজিস্টারে সংরক্ষণ করবেন।
মূল্যবান ধাতু ও বৈদেশিক মুদ্রা গুদামে গ্রহণের পর জরুরি ভিত্তিতে পুলিশ প্রহরায় নিকটস্থ বাংলাদেশ ব্যাংক বা ট্রেজারি ব্যাংকে জমা দিতে হবে। কোনো বিচারিক প্রক্রিয়া দুই মাসের মধ্যে শেষ না হলেও এসব পণ্য বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
আটক পণ্য নিষ্পত্তির আগে আমদানিকারক, রপ্তানিকারক, এজেন্ট বা দাবিদারকে দাবি প্রতিষ্ঠার সুযোগ দিতে সাত কর্মদিবসের নোটিশ দিতে হবে। ডাক, কুরিয়ার, ই-মেইল, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি, ডিজিটাল যোগাযোগ বা নোটিশ বোর্ডের মাধ্যমে নোটিশ দেওয়া যাবে।
নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দাবিদার তার দাবি প্রমাণ করতে পারলে এবং প্রযোজ্য শুল্ক-কর ও জরিমানা পরিশোধ করলে পণ্য খালাসের সুযোগ থাকবে। দাবিদার না পাওয়া গেলে বা দাবি প্রমাণিত না হলে আইন অনুযায়ী পণ্য রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করে পরবর্তী নিষ্পত্তির ব্যবস্থা করা হবে।
নতুন আদেশে নিলাম কমিটি গঠনের বিষয়েও বিস্তারিত নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কমিশনার একজন অ্যাডিশনাল কমিশনার বা জয়েন্ট কমিশনারকে আহ্বায়ক করে এক বা একাধিক নিলাম কমিটি গঠন করবেন।
নিলাম-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা, গুদাম কর্মকর্তা ও প্রয়োজনীয় অন্যান্য কাস্টমস কর্মকর্তারা কমিটির সদস্য থাকবেন। প্রয়োজনে সরকারি বা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকেও কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করা যাবে।
ই-নিলামের ক্ষেত্রে প্রথম নিলামকেই চূড়ান্ত হিসেবে গণ্য করার বিধান রাখা হয়েছে। সফটওয়্যার স্বয়ংক্রিয়ভাবে দরদাতাদের তুলনামূলক তালিকা তৈরি করবে। এরপর নিলাম কমিটি সর্বোচ্চ গ্রহণযোগ্য দরদাতা নির্ধারণ করে কমিশনারের কাছে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করবে।
কমিটির সুপারিশ পাওয়ার পর তিন কর্মদিবসের মধ্যে কমিশনারকে সিদ্ধান্ত দিতে হবে। অনুমোদনের তিন কর্মদিবসের মধ্যে বিজয়ী দরদাতার অনুকূলে বিক্রয়াদেশ দেওয়ার বিধান রয়েছে।
নিলামের আগে নির্দিষ্ট কিছু পণ্য সরকারি প্রতিষ্ঠান বা সংশ্লিষ্ট সংস্থার কাছে নিলাম ছাড়াই বিক্রি বা হস্তান্তর করা যাবে।
পরিশিষ্ট-৪-এ উল্লেখিত বিভিন্ন পণ্য বাংলাদেশ মেশিন টুলস ফ্যাক্টরি লিমিটেডের (বিএমটিএফ) কাছে সংরক্ষিত মূল্যের ন্যূনতম ৬০ শতাংশ দামে বিক্রি করা যাবে।
চিনি, লবণ, ডাল, সয়াবিন তেলসহ পচনশীল পণ্য টিসিবি কিনতে আগ্রহী হলে বোর্ড নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি করা যাবে।
স্বর্ণ, রৌপ্য, প্লাটিনাম, হীরা, জুয়েলারি ও বৈদেশিক মুদ্রা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। বিস্ফোরক, আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মতামতের ভিত্তিতে প্রতিরক্ষা বাহিনী বা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কাছে হস্তান্তর করা যাবে।
এ ছাড়া মদ ও মদ্যজাতীয় পানীয় এবং বিদেশি সিগারেট বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের কাছে বিক্রি করা যাবে। প্রত্নসম্পদ জাদুঘর বা সরকারি দপ্তরে এবং প্রাণী বা প্রাণীর দেহাবশেষ বন বিভাগ বা সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কাছে বিনামূল্যে হস্তান্তর করা যাবে।
ওষুধের কাঁচামাল ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের অনুমোদন সাপেক্ষে এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে বিক্রি করা যাবে।
নিলামে অংশ নিতে প্রতিষ্ঠানকে হালনাগাদ ট্রেড লাইসেন্স, মূসক নিবন্ধন, টিআইএন সনদ এবং হালনাগাদ আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রত্যয়নপত্র থাকতে হবে।
ব্যক্তিশ্রেণির দরদাতার ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র, টিআইএন সনদ এবং আয়কর রিটার্ন দাখিলের প্রত্যয়নপত্র প্রয়োজন হবে।
প্রতিটি লটের সংরক্ষিত মূল্যের ৫ শতাংশ হারে ফেরতযোগ্য জামানত দিতে হবে। ই-নিলামের ক্ষেত্রে ই-পেমেন্ট এবং অন্যান্য নিলামে পে-অর্ডার, ই-পেমেন্ট বা যাচাইযোগ্য নেগোশিয়েবল ইন্সট্রুমেন্টের মাধ্যমে জামানত দেওয়া যাবে।
নিলাম অনুষ্ঠানের কমপক্ষে সাত কর্মদিবস আগে একটি জাতীয় ও একটি স্থানীয় দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি এনবিআর ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের ওয়েবসাইটেও বিজ্ঞপ্তি দিতে হবে।
নিলামের আগে আগ্রহী ক্রেতাদের পণ্য পরিদর্শনের সুযোগ দিতে হবে। নিলামের দুই দিন আগে চূড়ান্ত তালিকাও প্রকাশ করতে হবে।
প্রচলিত পদ্ধতিতে প্রথম নিলামে সংরক্ষিত মূল্যের কমপক্ষে ৬০ শতাংশ দর পাওয়া গেলে সর্বোচ্চ দরদাতার কাছে বিক্রির সুপারিশ করা হবে। বিক্রি না হলে দ্বিতীয় ও তৃতীয় নিলাম অনুষ্ঠিত হবে। তিন দফাতেও বিক্রি সম্ভব না হলে মেগালট তৈরির মাধ্যমে পুনরায় নিলামে তোলার সুপারিশ করা যাবে।
বিক্রয়াদেশ পাওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে দরমূল্য, প্রযোজ্য উৎসে আয়কর ও মূসক পরিশোধ করতে হবে। অর্থ পরিশোধের পর তিন কর্মদিবসের মধ্যে ডেলিভারি অর্ডার এবং তা পাওয়ার পর তিন কর্মদিবসের মধ্যে পণ্য খালাস নিতে হবে।
নির্ধারিত বা বর্ধিত সময়েও পণ্য গ্রহণ না করলে বিক্রয় অনুমোদন বাতিল করে বিজয়ী দরদাতার জামানত রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করা হবে। পরে পণ্যটি পুনরায় নিলামে তোলা হবে।
নিলাম কার্যক্রমে মিথ্যা তথ্য, জাল দলিল, প্রকাশ্য বাধা বা অন্য অংশগ্রহণকারীকে ভয়ভীতি প্রদর্শনের মতো ঘটনা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে কালো তালিকাভুক্ত করার পাশাপাশি আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
নিলামে বিক্রি করা সম্ভব নয় এমন নিয়ন্ত্রিত, নিষিদ্ধ, গুণগতমান নষ্ট বা ধ্বংসযোগ্য পণ্য বিশেষায়িত সংস্থার কাছে হস্তান্তর করে ধ্বংস বা নিষ্ক্রিয় করা যাবে।
মদ ও মদ্যজাতীয় পানীয়, বিদেশি সিগারেট, আমদানি-রপ্তানি নীতি বা অন্যান্য আইনে নিষিদ্ধ পণ্য এবং মেয়াদোত্তীর্ণ পণ্যও নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় ধ্বংস করা যাবে।
পণ্য ধ্বংসের জন্য কাস্টমস, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, বন্দর কর্তৃপক্ষ, সিভিল এভিয়েশন, বিজিবি বা কোস্টগার্ড, পরিবেশ অধিদপ্তর এবং প্রয়োজন অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে।
ধ্বংসের আগে পণ্যের বিস্তারিত ইনভেন্টরি প্রস্তুত করতে হবে। ধ্বংসের স্থান ও সময় নির্ধারণের পর কমিটির সদস্যদের কমপক্ষে পাঁচ কর্মদিবস আগে জানাতে হবে। কার্যক্রম শেষে প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট কমিশনারের কাছে জমা দিতে হবে।
নতুন আদেশ অনুযায়ী নিলাম ও ধ্বংস কার্যক্রমের প্রতিবেদন প্রতি মাসের ১৫ তারিখের মধ্যে এনবিআরের নিলাম শাখায় পাঠাতে হবে।
নতুন স্থায়ী আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে। এর পরিশিষ্ট-৪-এ খাদ্যপণ্য, মসলা, ভোজ্যতেল, রাসায়নিক, কসমেটিকস, প্লাস্টিক, চামড়া, কাঠ, পোশাক, জুতা, টাইলস, ধাতু, যন্ত্রপাতি, ইলেকট্রনিকস, মোবাইল, যানবাহন, মেডিকেল সরঞ্জাম ও ফার্নিচারসহ মোট ৫৩ ধরনের পণ্যের তালিকা দেওয়া হয়েছে, যেগুলো নির্ধারিত শর্তে বিএমটিএফের কাছে বিক্রির আওতায় পড়তে পারে।

বুধবার, ১৯ আগস্ট ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ১৮ আগস্ট ২০২৬
