এক্সপোর্ট–ইমপোর্ট

জিইডির সামাজিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন: ৬৭% দরিদ্র সুবিধার বাইরে

দেশের সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থায় বড় ধরনের লক্ষ্যভ্রষ্টতার চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) এক মূল্যায়ন প্রতিবেদনে। এতে দেখা গেছে, যাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে, সেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বড় অংশই সুবিধার বাইরে রয়েছে। বিপরীতে সুবিধা পাওয়া মানুষের একটি বড় অংশ দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ নয়।প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে দেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর ৬৭ দশমিক ১ শতাংশ সামাজিক নিরাপত্তার সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল। অন্যদিকে সুবিধা পাওয়া ব্যক্তিদের ৬২ দশমিক ৮ শতাংশই দরিদ্র বা ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত ছিল না। অর্থাৎ প্রকৃত দরিদ্রদের বড় একটি অংশ সহায়তা না পেলেও সরকারি সুবিধা যাচ্ছে এমন অনেকের কাছে, যাদের তা প্রয়োজন নেই।মঙ্গলবার রাজধানীর বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে জিইডি আয়োজিত এসডিজি অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো-সংক্রান্ত জাতীয় সম্মেলনের ‘ভঙ্গুর অর্থনীতি পুনর্গঠন ও এসডিজি অর্জন’ শীর্ষক অধিবেশনে এসব তথ্য তুলে ধরা হয়।জিইডির মূল্যায়নে আরও দেখা গেছে, বিধবা ভাতা কর্মসূচিতে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিদের ৮৫ শতাংশই সুবিধাভোগীর তালিকার বাইরে রয়েছেন। ফলে প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও বিপুলসংখ্যক নারী সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। একই সঙ্গে অযোগ্য ব্যক্তিদের সুবিধাভোগীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রবণতাও রয়েছে।জিইডি বলছে, এ ধরনের ভুল অন্তর্ভুক্তির কারণে সরকারি অর্থের অপচয় হচ্ছে। পাশাপাশি স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের মাধ্যমে সুবিধা বণ্টনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।শুধু লক্ষ্যভ্রষ্টতাই নয়, সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাংলাদেশের ব্যয়ের পরিমাণও তুলনামূলকভাবে কম। দারিদ্র্য দূরীকরণকেন্দ্রিক প্রধান কর্মসূচিগুলোতে বাংলাদেশ জিডিপির মাত্র শূন্য দশমিক ৯ শতাংশ ব্যয় করে। যেখানে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর গড় ব্যয় ৩ দশমিক ৮ শতাংশ।সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার আরেকটি বড় সমস্যা হিসেবে কর্মসূচির খণ্ডিত কাঠামোর কথা উল্লেখ করেছে জিইডি। বর্তমানে মূল অর্থায়ন ৯৫টি ওভারল্যাপিং বা প্রায় একই ধরনের কর্মসূচির মধ্যে ছড়িয়ে রয়েছে। এর মধ্যে ছোট আকারের ৫০টি কর্মসূচিতে মোট বরাদ্দের ২ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যয় হয়। এতে প্রশাসনিক ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি একই ধরনের কাজ একাধিক কর্মসূচিতে পরিচালিত হচ্ছে এবং বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।এদিকে শহরের দরিদ্র জনগোষ্ঠীও সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় তুলনামূলকভাবে কম রয়েছে। দেশে বর্তমানে ১৪০টি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু থাকলেও এর মধ্যে মাত্র ২৩টি শহরের মানুষের জন্য। শহরকেন্দ্রিক এসব কর্মসূচিতে সামাজিক নিরাপত্তার মোট বরাদ্দের মাত্র ৪ শতাংশ ব্যয় হয়। ফলে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত শহরের দরিদ্র পরিবারগুলোর বড় অংশ সরকারি সুরক্ষার বাইরে থাকছে।জিইডির তথ্য অনুযায়ী, দেশে দারিদ্র্যের চাপও বেড়েছে। ২০২২ সালে দেশে মধ্যম দারিদ্র্যের হার ছিল ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০২৫ সালে মধ্যম দারিদ্র্যের হার বেড়ে ২৭ দশমিক ৯৩ শতাংশ এবং চরম দারিদ্র্যের হার ৯ দশমিক ৩৫ শতাংশে পৌঁছেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।এ অবস্থায় ২০২৬ থেকে ২০৩১ মেয়াদের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামোতে সামাজিক নিরাপত্তাব্যবস্থার সংস্কারে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। প্রকৃত সুবিধাভোগী শনাক্ত করতে ডিজিটাল নিবন্ধনব্যবস্থা চালু, সুবিধাভোগী নির্বাচনে স্বচ্ছতা বাড়ানো এবং একই ধরনের কর্মসূচি একীভূত করার উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। পাশাপাশি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি শহরের দরিদ্র পরিবারগুলোকে সামাজিক নিরাপত্তার আওতায় আনার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

জিইডির সামাজিক নিরাপত্তা মূল্যায়ন: ৬৭% দরিদ্র সুবিধার বাইরে